নিষ্ঠুর গলি

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:১৭ , আপডেট: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:২২

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


অধ্যাপক আকতার চৌধুরী

১৯৮৬ সালের কোনো এক বিকেলে কক্সবাজার শহরের তারাবনিয়ার ছড়া মসজিদের পাশে সাপ্তাহিক স্বদেশবাণীর (বর্তমান দৈনিক কক্সবাজার) অফিসে বসে আছি। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রবেশ করলেন সাগর বেলাল মামা।  পুরো নাম বেলাল উল ইসলাম সাগর ।(তিনি প্রয়াত একজন শিক্ষক)।  পত্রিকার সাহিত্য বিভাগটা সেই দুঃসময়ে তিনিই দেখাশোনা করতেন।  বেশ মজা করে কবিতাও লিখতেন। যদিওবা ওনার অনেক কবিতা আমি বুঝতাম না।  চালচলনে কাঁধে একটা ঝুলন্ত ব্যাগ আর পাঞ্জাবিতে কবি কবি ভাবটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন।  রিপোর্টিংও করতেন।  তা ছাড়া সম্পাদকের আত্মীয় হিসেবে কিছুটা ভাবও ছিল। তবে আমি জুনিয়র হলেও আত্মীয়তার সূত্রে মামা-ভাগ্নে হওয়ায় ঠাট্টা-মশকরিও কম হতো না।

মামার ঝুলি থেকে সব সময় কবিতা বের হতো। আমাকে দেখাতেন। পত্রিকায় ছাপাতেন। আজ কেন জানি গদ্য আকারের লেখা দেখা যাচ্ছে। একটু আগ বাড়িয়ে দেখতে গিয়ে হেডলাইনটা চোখে পড়ল – ‘নিষ্ঠুর গলি’!

আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল।

একটু মুচকি হেসে বেলাল মামার জিজ্ঞাসা – তুমি কি জান কক্সবাজার শহরে ‘নিষ্ঠুর গলি’ নামে একটা গলি আছে?

আমার স্বাভাবিক উত্তর – না তো মামা!

এত বছর কক্সবাজার শহরে বসবাস। প্রত্যেক গলির নাম আমার মুখস্থ। অথচ এ নামে একটা গলি আছে, আমার জানা ছিল না। তার ওপর গলির নামের সাথে নিষ্ঠুরতার কী সম্পর্ক!

তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান সকলের প্রিয় আবচার ভাই অনেক রাস্তা-অলিগলির নামকরণও শুরু করেছিলেন। যেমন—রাজনৈতিক দলগুলোর কমন জনসভাস্থল লালদীঘির পশ্চিম পাড়কে ‘বঙ্গবন্ধু সড়ক’, সার্কিট হাউস রোডকে ‘শহীদ সরণী’, সায়মন রোডকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সরণী’, হলিডে মোড় থেকে লাবণী সড়ককে ‘বিজয় সরণী’ নামকরণ করেন। কিন্তু ‘নিষ্ঠুর গলি’ নামকরণ তো কোথাও করা হয়েছে বলে শুনিনি। সেদিনের ‘নিষ্ঠুর গলি’ নামকরণটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে।

কক্সবাজার শহরে তখন আমরা কলেজপড়ুয়া জুনিয়র গ্রুপ। কিন্তু রোমিও সেজে অলিতে-গলিতে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ তেমন আমাদের হয়নি। কারণ সিনিয়র রোমিও ভাইদের দাপটে আমাদের কোনোঠাসা অবস্থা। তখন শহরে কংফু-কারাতে শেখার একটা আলাদা প্রবণতা ছিল। পুরো শহরের রোমিওরা কোনো না কোনো কারাতে গ্রুপের সদস্য থাকত। তাদের এলাকাও ভাগ ছিল। এক এলাকার রোমিও আরেক এলাকায় প্রবেশ নিষেধ।  পেলে উত্তম-মধ্যম দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এদের মধ্যে ‘কারাতে মনজুর’ গ্রুপ (প্রয়াত এড. আবুল মনজুর ), কারাতে আবু গ্রুপ ( কক্সবাজার পৌরসভার কর্মকর্তা), কারাতে সিরাজ গ্রুপ ( কক্সবাজার পৌরসভার কমিশনার) অন্যতম ছিল।  যাদের নাম বললাম, সবাই আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই।  এছাড়াও আরও অনেকগুলো কারাতে গ্রুপ কক্সবাজারের অলিগলিগুলো নিয়ন্ত্রণ করত, যাদের অনেকের নাম এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।

ওই নিষ্ঠুর গলিতে অনেকগুলো বড় আপু ছিল।  দেখতে সুন্দরী।  দেমাগও কম না। গলিতে তাদের চলাফেরাও ডেমকেয়ার টাইপের। আর সিনিয়র গ্রুপের রোমিও বড়ভাইরা দাঁড়িয়ে থাকত গলিতে। কখনো ‘আই লাভ ইউ’ লেখা কাগজের টুকরো ছুড়ে মারত, কখনো অতিকষ্টে জোগাড় করা লাল গোলাপটা নিজের মুখের কাছে এনে গন্ধ শুকত—দেওয়ার সাহস হতো না। আপুরাও কম পাষাণী ছিল না। ছুড়ে দেওয়া কাগজটা তুলে নিয়ে একটু পড়ে দেখার আগ্রহও দেখাত না। এদিকে রোমিও বড়ভাইদের বুকটা ফেটে যেত। অপমানবোধও হতো। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে দেখে ঠাট্টা করত—তোকে তো পাত্তাই দিল না! বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্রও হতো।

নিষ্ঠুর গলির এমন প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পেরে সকল রোমিওর যৌথ উদ্যোগে এক আপুকে জোর করে ধরে নিয়ে বিয়েও করেছিল। অবশ্য তাদের এখন সুখের সংসার চারদিকে শোভিত হচ্ছে। এই একটা ঘটনা ছাড়া নিষ্ঠুর গলির বাকি আপুদের বিয়ে কক্সবাজার শহরের কারও সাথে হয়নি। সবাই এখন বিভিন্ন শহরে প্রতিষ্ঠিত স্বামীদের সংসারে। মনে হয় তাদের একটা সংকল্প ছিল—ঘরের গরু ঘাটের ঘাস খাবে না।

শেষে মনের দুঃখে গলির রোমিওদের একজন রাতের বেলা চিকা মারার ব্রাশ নিয়ে গলির দেয়ালে লিখে দেয় ‘নিষ্ঠুর গলি’।

সে লেখাটা আমরা আসা-যাওয়ার সময় দেখতাম। হাসতাম। এই গলির আপুদের নিষ্ঠুরতার কথা স্মরণ করে নারীদের হাত থেকে ১০০ হাত দূরত্ব বজায় রাখার মনস্থ করতাম।

প্রায় একই সময়ে কক্সবাজার শহরে আরও একটা গলির নামকরণ করা হয়েছিল। এ গলির কাহিনীটা একটু করুণ। ভালোবেসেছিল এ গলির এক আপুকে আরেক গলির রোমিও বড়ভাই। তবে ভালোবাসার গভীরতায় বিয়ের আগে অঘটনটা ঘটে যায়। অবস্থা কাহিল। আপুর পেটে সন্তান। এদিকে রোমিও বড়ভাই বিয়ে করতে অস্বীকার করে বসে। এনিয়ে পাড়ায় অনেক সালিশ-নালিশ, বৈঠক। কোনো সুরাহা নেই। এই ফাঁকে কেউ একজন গলিতে চিকা মেরে লিখে দেয় ‘কলঙ্কিত গলি’। শহরে রটে যায়। এ নিয়ে বিব্রত হয় গলির বসবাসকারী সবকটা পরিবার। পরে অবশ্য সমাজের চাপে রোমিও বড়ভাই জুলিয়েট আপুকে বাচ্চাসহ ঘরে তুলে নিয়ে ‘কলঙ্কিত গলি’র কলঙ্ক দূর করেছিলেন।

জানি না, আজকালকার ভালোবাসা দিবসের সাথে তখনকার ‘নিষ্ঠুর গলি’ ও ‘কলঙ্কিত গলি’র কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা। তবে ভালোবাসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এই গলিগুলোর নামকরণ। ভালোবাসা চিরন্তন, শাশ্বত। কোনো বিশেষ দিবসকে ঘিরে নয়। ভালোবাসায় প্রতিদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি—প্রতিদিনই ভ্যালেন্টাইন ডে।


অধ্যাপক আকতার চৌধুরী, সম্পাদক, কক্সবাজারনিউজ ডটকম